begumganj

নোয়াখালী জেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সমৃদ্ধ একটি থানা অঞ্চল… নাম বেগমগঞ্জ। এটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও সারাদেশে সুপরিচিত। যেখানে সবুজে ঘেরা ফসলী মাঠ ভেদ করে বয়ে চলা সড়কের পাশাপাশি চোখে পড়ে ক্রমবর্ধমান ব্যস্ত নগরীর চিত্র। এ অঞ্চলটির নামকরনের সুনির্দিষ্ট কোনো ইতিহাস পাওয়া না গেলেও জনশ্রুতি আছে, মুঘল শাসনামলে তৎকালীন বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খান তার স্ত্রীকে নিয়ে এ অঞ্চল পরিভ্রমনে আসেন। তার আগমনের পর থেকেই এটি “বেগমগঞ্জ” নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ থানা অঞ্চলটি ১৯৯১ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যার বিচারে দেশের সর্ববৃহৎ উপজেলা হিসেবে স্বীকৃত ছিলো। তবে, ২০০৫ সালে বৃহত্তর বেগমগঞ্জ থেকে সোনাইমুড়ীকে আলাদা করে একটি পৃথক উপজেলা গঠন করা হয়।

 

 

অবস্থানঃ

রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ১৫৩ কিলোমিটার দক্ষিনপূর্বাংশে এবং নোয়াখালী সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত একটি বিচিত্র জনপদ বেগমগঞ্জ। যার পূর্বদিকে সেনবাগ উপজেলা, পশ্চিমে লক্ষ্মীপুর সদর ও চাটখিল উপজেলা, উত্তরে সোনাইমুড়ি ও চাটখিল উপজেলা এবং দক্ষিণে নোয়াখালী সদর উপজেলার অবস্থান। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী প্রায় ২৩৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ জনপদটিতে বসবাস করেন প্রায় ৫ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ। বর্তমানে এ থানা অঞ্চলটি ১টি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত। ইউনিয়ন সমূহ হল আমানউল্যাপুর, গোপালপুর, জিরতলী, আলাইয়ারপুর, ছয়ানী, রাজগঞ্জ, একলাশপুর, বেগমগঞ্জ, মিরওয়ারিশপুর, নরোত্তমপুর, দুর্গাপুর, কুতুবপুর, রসুলপুর, হাজীপুর, শরীফপুর, ও কাদিরপুর।

মুক্তিযুদ্ধঃ

একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের রক্তঝরা দিন গুলোতে বেগমগঞ্জে রচিত হয়েছে গৌরবময় আত্মত্যাগের ইতিহাস। থানা অঞ্চলটি নোয়াখালী জেলার প্রান কেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় এখানে পাকিস্তানী হানাদাররা তাদের ক্যাম্প স্থাপন করে এবং নির্বিচার গণহত্যায় মেতে ওঠে। তাদের সমূলে উৎখাত করতে এলাকার আমিনবাজার, চন্দ্রগঞ্জ, গোপালপুর, চৌমুহনি সহ বেশ কিছু স্থানে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তলে। অতঃপর, ৬ই ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় বেগমগঞ্জ। মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের স্মৃতি সংরক্ষনে চৌমূহনি ও সোনাপুরে স্থাপন করা হয়েছে ২টি স্মৃতিস্তম্ভ, দমদমা দিঘীর পাড় বদ্ধভুমি ও ৭১ জাদুঘর। *মুক্তিযোদ্ধা বাইট

শিক্ষাঃ

স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই এ অঞ্চলে শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে। ফলে বর্তমানে শিক্ষার হার ৫৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। স্থাপিত হয়েছে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ১টি মেডিকেল কলেজ ও ১টি কৃষি প্রশিক্ষন ইন্সটিটিউটের পাশাপাশি ৫টি কলেজ, নোয়াখালী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বেগমগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ সহ প্রায় ৬৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, প্রায় ১৯০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মাদ্রাসা।

যোগাযোগঃ

সারাদেশে চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বেগমগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও এসেছে দৃশমান উন্নয়ন। নির্মিত হয়েছে প্রশস্থ সড়ক, মহাসড়ক ও পর্যাপ্ত ব্রিজ কালভার্ট। এ থানা অঞ্চল দিয়েই  বয়ে গেছে ফেনী – নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক ও কুমিল্লা – নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক, যা সম্প্রতি ২ লেন থেকে ৪ লেনে উন্নীত করা হয়েছে। রেলপথে যাতায়াতে রয়েছে চৌমুহনী রেলওয়ে ষ্টেশন। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের সুবিধার্থে নির্মিত হয়েছে প্রায় ৩৯৬ কিলোমিটার পাকারাস্তা, ৩৬ কিলোমিটার আধাপাকা রাস্তা সহ পর্যাপ্ত ব্রিজ কার্লভার্ট। নগরীর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন চত্বর থেকে এসব সড়ক, মহাসড়ক ব্যবহার করে বেশ সহজেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করতে পারছেন এ এলাকার জনসাধারণ।

অর্থনীতিঃ

বেগমগঞ্জ মডেল থানা পুলিশের সার্বক্ষণিক কর্মতৎপরতায় নিরাপদে ও বেশ স্বাচ্ছন্দেই জীবনযাপন করছেন এ থানা এলাকার জনগন। বেগমগঞ্জ একটি উর্বর এলাকা হওয়ায় মোট জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষই কৃষি কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তবে, বেগমগঞ্জের চৌমুহনী.. নোয়াখালী জেলার বাণিজ্য শহর হিসেবে বিখ্যাত হওয়ায় নোয়াখালী জেলার ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত এ থানা অঞ্চল। এখানে দেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি গ্যাস ক্ষেত্র থাকায় এ অঞ্চলে শিল্পন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন দ্বার উন্মোচন হচ্ছে। তাছাড়া, বেগমগঞ্জ একটি প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে।

স্বাস্থ্যঃ ও প্রেসক্লাবঃ

থানা বাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে রয়েছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১০ শয্যা বিশিষ্ট একটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। রয়েছে ১০টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং বেশ কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক। এছাড়া পশুপাখির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রয়েছে উপজেলা প্রানিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল।  এ থানা অঞ্চলে রয়েছে স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বশিল সংগঠন বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাব।

দর্শনীয় স্থানঃ

অতীতে এ অঞ্চলটি ছিল একটি জমিদার অধ্যুষিত এলাকা। সেসময়ের জমিদারদের শাসনামলের স্মৃতি বহন করে এখানে আজও টিকে আছে গোপালপুর জমিদার বাড়ি। পাশেই রয়েছে জমিদারদের স্থাপিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট গোপালপুর চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদ… যার দেয়ালের অসাধারন কারুকার্য ও স্থাপত্যশৈলী মুগ্ধ করে এখানে আগত দর্শনার্থীদের। এছাড়া এখানে আরও রয়েছে প্রায় ৭০০ বছর পুরনো ঐতিহাসিক কমলার দীঘি, সৈয়দ শের আলম বাগদাদির মাজার ও হিন্দু ধর্মের বিখ্যাত তীর্থ স্থান রাধামাধব মন্দির।

 

error: কপি না করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।