Companyganj

কোম্পানীগঞ্জ… বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা পলিমাটি আর ডাকাতিয়া নদী বিধৌত একটি বিস্তৃত থানা অঞ্চল। যেখানে নিয়মিত সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে বয়ে চলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্প। জানা যায়, ভাঙ্গাগড়া এ জনপদটিতে বৈদিক যুগে প্রায় ১৪০০ খৃষ্ট পূর্বাব্দে জনবসতী গড়ে উঠে। ব্রিটিশ শাসনামলে, সিরাজপুরের যোগিদীয়ায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্র বন্দর থাকায় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে তাদের কুঠি স্থাপন করে। সেই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামানুসারেই এ এলাকার নামকরন হয় কোম্পানীগঞ্জ। এ অঞ্চলটি স্থানীয়দের কাছে বসুরহাট নামেও বহুলভাবে পরিচিত। ১৮৮৮ সালে কোম্পানীগঞ্জ একটি থানা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে যা দেশভাগের পর ১৯৮৩ সালে উপজেলায় উন্নীত হয়।

 

 

অবস্থানঃ  

রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ১৬৯ কিলোমিটার দক্ষিনপূর্বে এবং নোয়াখালী সদরের ২১ কিলোমিটার পূর্বাংশে অবস্থিত এক চরসাদৃশ্য জনপদ কোম্পানিগঞ্জ। এ এলাকার পূর্বপাশে রয়েছে সোনাগাজী এবং মিরসরাই উপজেলা, পশ্চিমে নোয়াখালী সদর ও কবিরহাট উপজেলা, উত্তরে সেনবাগ ও দাগনভূঞা উপজেলা এবং দক্ষিণে সুবর্ণচর ও সন্দ্বীপ উপজেলা সহ বিস্তৃত জলরাশি। ৩৮৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বৃহৎ এ থানা অঞ্চলটিতে ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বসবাস করেন প্রায় আড়াই লক্ষাধিক মানুষ। কোম্পানীগঞ্জ ১টি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত। ইউনিয়ন সমুহ হল সিরাজপুর, চর পার্বতী, চর হাজারী, চর কাঁকড়া, চর ফকিরা, রামপুর, মুছাপুর ও চর এলাহী।

মুক্তিযুদ্ধঃ  

৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শুরু থেকেই বেশ তৎপর ছিলো এখানকার মুক্তিকামী জনতা। পাকবাহিনী বসুরহাট এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করলে, তাদেরকে প্রতিহত করার ছক আঁকেন মুক্তিযোদ্ধারা। বেড়ি বাঁধের যুদ্ধ ও বসুরহাটের যুদ্ধসহ বিভিন্ন সম্মুখ সমরে প্রান দিতে হয় বহু মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ বাঙালিকে। সব শেষ ৬ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী বসুরহাট রাজাকার ক্যাম্প আক্রমন করলে ৭ ডিসেম্বর ভোরে ৯০ জন পাকসেনা ও রাজাকারেরা আত্মসমর্পণ করে। এভাবেই শত্রুমুক্ত হয় পুরো কোম্পানিগঞ্জ। মুক্তিযুদ্ধের এসব গৌরবময় স্মৃতি সংরক্ষিত রাখতে নির্মিত হয়েছে ভাস্কর্য, গনকবর ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন।

যোগাযোগঃ

স্বাধীনতার এতো বছর পর, উন্নয়নের ধারায় বদলে যাচ্ছে কোম্পানীগঞ্জ। যোগাযোগ খাতেও এসেছে এর বাস্তব প্রতিফলন। যাতায়াত সহজতর করতে সম্প্রসারিত করা হয়েছে সড়কপথ। দুরপাল্লার যোগাযোগে নির্মিত হয়েছে বসুরহাট – কবিরহাট সড়ক, দাগনভুঁইয়া – কোম্পানীগঞ্জ সড়ক,

কবিরহাট – চাপরাশিরহাট সড়ক ও  বিভিন্ন আঞ্চলিক রাস্তা। তাছাড়া নদীকেন্দ্রিক জনপদ হওয়ায় নৌপথেও যাতায়াত করতে পারছে থানাবাসী। রয়েছে মোট ২৭৫ কিলোমিটার পাকারাস্তা সহ অভ্যন্তরীণ সড়কপথ, ৩৫ কিলোমিটার নৌপথ ও পর্যাপ্ত ব্রিজ-কালভার্ট। তবে, এ থানা অঞ্চলের একাংশ চরাঞ্চল এবং বিচ্ছিন্ন এলাকা থাকায় পুলিশি কার্যক্রমে কিছুটা বেগ পেতে হয় থানার পুলিশ সদস্যদের।

অর্থনীতিঃ

কোম্পানিগঞ্জ থানা পুলিশের নিবিড় তত্ত্বাবধায়নে এ অঞ্চলের মানুষজন নির্বিঘ্নে তাদের জীবনমান পরিচালনা করে আসছে। বিস্তৃত কৃষিজমি, চরাঞ্চল ও নদী-জলাশয় থাকায় এ এলাকায় কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের আধিক্য লক্ষ করা যায়। ফলে, প্রধান অর্থকরী ফসলের বাইরেও উৎপাদিত হচ্ছে নারিকেল, সুপারি সহ বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজি ও মৌসুমি ফলমুল। পাশাপাশি চাকুরি, ব্যবসা, পরিবহণ খাত সহ প্রবাসে থেকে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে কোম্পানিগঞ্জবাসী।

ধর্মঃ

এটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপদ হলেও অসম্প্রদায়িক এ অঞ্চলটিতে রয়েছে হিন্দু, মুসলিম,বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সম্মিলিত বসবাস। তাদের উপাসনার জন্য রয়েছে প্রায় ২৪২টি মসজিদ ও ৩৯টি মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।

স্বাস্থ্য

থানাবাসীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে রয়েছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৭টি পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র, ১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও বেশ কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক। এছাড়া পশুপাখির সুচিকিৎসায় স্থাপিত হয়েছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল । এছাড়া এ থানা অঞ্চলে রয়েছে স্থানীয় গনমাধ্যমকর্মীদের সম্মিলিত সংগঠন কোম্পানীগঞ্জ প্রেসক্লাব।

শিক্ষাঃ

বর্তমানে কোম্পানিগঞ্জে শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ তথ্যমতে, শিক্ষার হার ছাড়িয়েছে ৫১ শতাংশে। রয়েছে ৪টি কলেজ, ১টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,
বসুরহাট এ.এইচ.সি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও বামনী উচ্চ বিদ্যালয় সহ ৩২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৯০টিরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মাদ্রাসা এবং পাঠাগার। এসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়াতে কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ নানামুখী সচেতনতা মুলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

দর্শনীয় স্থানঃ

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা কোম্পানীগঞ্জ থানা অঞ্চলটিতে রয়েছে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান, বিনোদন কেন্দ্র ও পার্ক। উপকূলীয় বিস্তৃত বনভূমি থাকায় সবুজের সমারোহ লক্ষ্য করা যায়। মুসাপুর ইউনিয়নে বৃহৎ এলাকা জুড়ে রয়েছে মুছাপুর সমুদ্র সৈকত। যার এক দিকে সবুজ ঝাউবন, অপর দিকে বিস্তৃত জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভীর জমায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুরা। আগত দর্শনার্থীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে সোচ্চার অবস্থানে থাকেন কোম্পানিগঞ্জ থানার পুলিশ সদস্যগন।

কৃতিসন্তানঃ

কোম্পানিগঞ্জ দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গের আঁতুড়ঘর। এখানেই জন্মগ্রহন করেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এছাড়া শিক্ষা সংস্কারক ও অবিভক্ত বাংলার এমএলএ মৌলভি আমিন উল্লাহ খান বাহাদুরেরও জন্মস্থান এই থানা অঞ্চল।

error: কপি না করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।