চেনা হুমায়ূন, অচেনা হুমায়ূন! 

স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও দুই পুত্রের সাথে হুমায়ূন আহমেদ | ছবি: সংগৃহীত
হুমায়ূন আহমেদকে তেমন করে চিনতাম না। না চেনার কারণ তার বই পড়া হয়নি। না পড়ারও একটা কারণ আছে; মুখে মুখে শুনতাম তিনি সস্তা লেখা লেখেন। যা ইচ্ছে তাই লেখেন। বেশি বেশি লেখেন, আবোল-তাবোল লেখেন এবং তিনি নাকি ধর্মবিরোধী! এসব মুখে মুখে শোনার পর টাকা দিয়ে তার বই পড়া প্রয়োজন বোধ করতাম না! কিন্তু একবার একটি সাহিত্য প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হিসেবে দুটি বই উপহার পেয়েছি। একটি অপেক্ষা অন্যটি মধ্যাহ্ন। দু’টি বইয়ের লেখক হুমায়ূন আহমেদ। আবার এর কিছুদিন পর আরো একটি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হিসেবে পেলাম গৌরিপুর জংশন বইটি। যেহেতু উপহার পেয়েছি তাই বইগুলো পড়া এক প্রকার দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে! আবার মনে মনে এ কথাও আছে।দেখি কি লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ।
পড়তে শুরু করলাম হুমায়ূন। চুম্বকের মতো আটকিয়ে রাখছে চোখ দুটি প্রতিটি পৃষ্ঠায়, প্রতিটি লাইনে! মানুষ অপেক্ষা করে বেঁচে থাকে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করে। কেউ হয়তোবা করে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষা, কেউ হয়তোবা করে মৃত্যুর। সুরাইয়া তার ইমনের বাবার অপেক্ষা করে, ইমন তার ছোটো চাচ্চুর অপেক্ষা করে, তাদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না। অপেক্ষা পড়তে গিয়ে মনের অজান্তেই অপ্রিয় মানুষটি প্রিয় হয়ে গেল। তারপর পড়তে লাগলাম- মধ্যাহ্ন, বহুব্রীহি, বাদশাহ নামধার, দেবী, দেয়াল, বৃষ্টি বিলাস, নীলাবতীর মৃত্যু, অমানুষ, হিমু সমগ্র, গৌরিপুর জংশনের মত কালজয়ী সব উপন্যাস। তারপর মনের কোণে সবচেয়ে প্রিয় লেখকের নাম যোগ হয়ে গেল হুমায়ূন আহমেদ!
কিন্তু তাহলে যে শুনেছিলাম, ধর্মবিরোধী হুমায়ূন আহমেদ, এসব কি ভুল? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে মাহফুজ আহমেদের একটি সাক্ষাৎকারে ঝাঁঝালো এক প্রশ্নের জবাবে!
‘এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?’
কালক্ষেপণ না করে হুমায়ূন আহমেদ বলে উঠলেন- ‘আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজে যারা আছেন, তাদের কার্যক্রম খুব একটা পরিষ্কার না। এরা কেন জানি ইসলাম ধর্মকে খুব ছোট করে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান অন্য যেকোনো ধর্মের প্রায় সব উৎসবে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত থাকেন, বক্তৃতা করেন, বাণী দেন- কিন্তু ইসলামী কোনো জলসায় কেউ উপস্থিত থেকেছেন বলে শোনা যায় না। তাদের মতে, ইসলামী জলসায় কেউ উপস্থিত থাকা মানে তার বুদ্ধিবৃত্তি নিম্নমানের। সে একজন প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক লোক। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কাছে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টানদের কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অর্থ মুক্তবুদ্ধি চর্চা করা, প্রগতির চর্চা করা, সংস্কারমুক্ত হওয়া ইত্যাদি।
নোবেলজয়ী প্রফেসর সালাম ঢাকায় এসে যখন বক্তৃতার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বললেন, তখন আমাদের বুদ্ধিজীবীরা হকচকিয়ে গেলেন। কারণ তাদের কাছে প্রগতিশীল হওয়া, বুদ্ধিজীবী হওয়া, মুক্তবুদ্ধি চর্চা করা মানেই ইসলামবিরোধী হতে হবে। তাদের কাছে রামকৃষ্ণের বাণী, যিশুর বাণী সবই গ্রহণীয়। এসব তারা উদাহরণ হিসেবেও ব্যবহার করেন; কিন্তু হজরত মোহাম্মদ সা:-এর বাণী কখনো তাদের মুখ থেকে শোনা যায় না। তাদের কাছে তাঁর বাণী গ্রহণযোগ্য নয়।
আমার মতে, পৃথিবীর তাবৎ ঔপন্যাসিক যার কোটের পকেট থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তার নাম দস্তয়ভস্কি। আরেকজন আছেন মহামতি টলস্টয়। এক রেলস্টেশনে যখন টলস্টয় মারা গেলেন, তখন তার ওভারকোটের পকেটে একটি বই পাওয়া গেছে। বইটি ছিল টলস্টয়ের খুব প্রিয়। সব সময় সঙ্গে রাখতেন। সময় পেলেই পড়তেন। বইটি হজরত মোহাম্মদ সা:-এর বিভিন্ন সময়ে বলা গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো নিয়ে গ্রন্থিত।
আমি বিনয়ের সাথে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কাছে জানতে চাইছি, আপনাদের ক’জন বইটি পড়েছেন? টলস্টয় যে বইটি পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, সেই বই আমাদের প্রত্যেকের একবার কি পড়া উচিত নয়? আমার মতে, প্রতিটি শিক্ষিত ছেলেমেয়ের বইটি পড়া উচিত। তথ্য: ঘরে বাইরে হুমায়ূন আহমেদের হাজার প্রশ্ন-মাহফুজ আহমেদ। টলস্টয়ের পকেটে পাওয়া বই- সেইং অব প্রফেট।
এখানে শেষ নয়! এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ূন আহমেদকে বিচার করা যায় না। তিনি ধর্মের প্রতি কতটা যত্নবান ছিলেন কিংবা কতটা সহনশীল ছিলেন তা বোঝা যাবে তার সর্বশেষ লেখা দ্বারা। প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে গ্রন্থ লেখার কাজ ছিল তার সর্বশেষ কাজ। গ্রন্থটির নাম দিয়েছেন ‘নবীজি’। তার প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্মেছিল যখন জেনেছি তিনি প্রিয় নবীজিকে নিয়ে বই লিখতে শুরু করেছিলেন এবং এটিই ছিল তার জীবনে শেষ বই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটি শেষ করা হলো না। তার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ!

সেই বই সম্পর্কে কিছু কথা বলি-
‘নবীজী’ হুমায়ূন আহমেদের অসমাপ্ত এবং অপ্রকাশিত গ্রন্থ। বইটির বিষয়- মহানবী সা:-এর জীবন-দর্শন। লেখাটি শুরু করতে পারলেও শেষ করতে পারেননি। এর আগেই তিনি ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
নবীজী গল্পের প্রস্তুতি সম্পর্কে হুমায়ূন বলেছিলেন- আমার প্রস্তুতির কথা বলব, কিন্তু এখানেও কিছু সমস্যা আছে। সমস্যা হলো দুই ধরনের। প্রথম সমস্যা হলো, আমার মধ্যে কিছু ছেলেমানুষি আছে তো! আমি যখন সব কিছু ঠিকঠাক করলাম, তখন একটা ঘটনা ঘটে। শুরু থেকেই বলি। বাংলাবাজারে অন্যপ্রকাশের একটি স্টল আছে। স্টলটি উদ্বোধনের জন্য আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক দিন পরে আমি বাংলাবাজারে গেলাম। স্টলের ফিতাটি কাটলাম। এক মাওলানা সাহেব প্রার্থনা করলেন। আমি খুবই অবাক হয়ে তার প্রার্থনা শুনলাম। আমার কাছে মনে হলো, এটি বইপত্র সম্পর্কিত খুবই ভালো ও ভাবুক ধরনের প্রার্থনা। একজন মাওলানা এত সুন্দর করে প্রার্থনা করতে পারেন যে আমি একটা ধাক্কার মতো খেলাম। মাওলানা সাহেবকে ডেকে বললাম, ‘ভাই, আপনার প্রার্থনাটা শুনে আমার ভালো লেগেছে।’ মাওলানা সাহেব বললেন, ‘স্যার, আমার জীবনের একটা বড় আকাঙ্খা ছিল আপনার সঙ্গে একদিন দেখা হবে। আল্লাহ আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।’
আমি তার কথা শুনে বিস্মিত হলাম। আমি বললাম, ‘এই আকাক্সক্ষাটি ছিল কেন?’ মাওলানা সাহেব বললেন, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই কারণ আমি ঠিক করেছি, দেখা হলেই আপনাকে আমি একটা অনুরোধ করব।’
‘কী অনুরোধ শুনি?’
‘আপনার লেখা স্যার এত লোকজন আগ্রহ নিয়ে পড়ে, আপনি যদি আমাদের নবী করিমের জীবনীটা লিখতেন, তাহলে বহু লোক এই লেখাটি আগ্রহ করে পাঠ করত। আপনি খুব সুন্দর করে তাঁর জীবনী লিখতে পারতেন।’
মাওলানা সাহেব কথাগুলো এত সুন্দর করে বললেন যে আমার মাথার ভেতর একটা ঘোর তৈরি হলো। আমি তার কাঁধে হাত রেখে বললাম, ‘ভাই, আপনার কথাটা আমার খুবই মনে লেগেছে। আমি নবী করিমের জীবনী লিখব।’ এই হলো ফার্স্ট পার্ট।
চট করে তো জীবনী লেখা যায় না। এটা একটা জটিল ব্যাপার, কাজটা বড় সেনসেটিভ। এতে কোথাও একটু উনিশ-বিশ হতে দেয়া যাবে না। লিখতে গিয়ে কোথাও যদি আমি ভুল তথ্য দিয়ে দিই, এটি হবে খুবই বড় অপরাধ। এটা আমাকে লেখা শুরু করতে বাধা দিলো। লেখাটি শুরু করার প্রসঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন- তখনও আমি লেখার কাজ শুরু করিনি। অন্যদিন-এর মাসুমকে বললাম, ‘তুমি একটা সুন্দর কভার তৈরি করে দাও তো। কভারটা চোখের সামনে থাকুক। তাহলে আমার শুরু করার আগ্রহটা বাড়বে।’ মাসুম খুব চমৎকার একটা কভার তৈরি করে দিলো। বইটার নামও দিলাম, ‘নবীজী’। তখন একটা ছেলেমানুষি ঢুকে গেল মাথার মধ্যে। ছেলেমানুষিটা হলো, আমি শুনেছি বহু লোক নাকি আমাদের নবীজীকে স্বপ্নে দেখেছেন। কিন্তু আমি তো কখনো তাঁকে স্বপ্নে দেখিনি। আমি ঠিক করলাম, যেদিন নবীজীকে স্বপ্নে দেখব, তার পরদিন থেকে লেখাটা শুরু করব।
স্বপ্নে এখন পর্যন্ত তাঁকে দেখিনি। যেহেতু এক ধরনের ছেলেমানুষি প্রতিজ্ঞার ভেতর আছে, সে কারণে লেখাটা শুরু করতে পারিনি। ব্যাপারটা হাস্যকর। তবু আমি স্বপ্নের অপেক্ষায় আছি।
সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের নেয়া একটি সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। এরপরে তিনি নবীজীকে স্বপ্নে দেখেছিলেন কী-না সে ব্যাপারে জানা যায়নি। তবে লেখাটি তিনি শুরু করেছিলেন। শেষ করতে পারেননি। এর আগেই এই কিংবদন্তি লেখক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পরকালে পাড়ি জমান।
ক্ষণিক সময়ে সাহিত্যের মাধ্যমে হুমায়ূন তার সৃষ্টিকর্ম দিয়ে যতটা প্রভাব ফেলে সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ে, তা আজন্ম বহমান থাকবে। তার কর্মের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে থাকবেন।

লেখক: ফরিদ উদ্দিন রনি,  ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক

error: কপি না করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।