নগর সভ্যতার সুচনা লগ্নে নগরকান্দা এলাকাটি ছিল একটি জলা ভূমি অঞ্চল। কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে অঞ্চলটি বসবাস যোগ্য হয়ে উঠে। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০৬ সালে সর্ব প্রথম প্রশাসনিক থানার ছোয়া লাগে বর্তমান নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত আইনপুর গ্রামে। স্থানীয় জনসাধারনের অসচেতনতা ও ক্রমাগত নদী ভাংগনের প্রেক্ষিতে উক্ত থানা সদর দপ্তরের স্থানান্তর অনিবার্য্য হয়ে পড়ে। তৎকালীন চৌদ্দরশি জমিদারগণ তাদের প্রশাসনিক সুবিধার্থে তাদেরই খাজনা আদায়ের কাচারী ঘরের পাশে বর্তমান নগরকান্দা থানা সদর কার্যালয়ের জন্য জমি দান করেন।তাই বলা যেতে পারে ততকালিন মহকুমার প্রাচীন প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে নগরকান্দা একটি অন্যতম অঞ্চল।

নগরকান্দার ইতিহাস

১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে নগরকান্দা উপজেলায় পরিণত হয় এবং তার প্রায় ১৫ বছর পর ১৯৯৯ সালে নগরকান্দা পৌরসভা গঠনের মাধ্যমে অঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও জনপ্রতিনিধি কতৃক সেবার মান বৃদ্ধি পায়।কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতক অস্থিরতায় অঞ্চলটি ধীরে ধীরে একটি বিশৃংখল এলাকায় পরিনত হয়।১৯১.৯৬ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট নগরকান্দা উপজেলারািছু বিশেষ পদক্ষেপ বাস্তাসনিকয় ধীরে ধীরে পুনরায় বুকচিরে প্রবাহমান কুমার নদীর তীর ধরে গড়ে ওঠা এ জনপদ কিভাবে নগরকান্দা নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ নিয়ে স্থানীয়দের মুখে রয়েছে নানান গুঞ্জন।ধারণা করা হয় একসয়ের নগরের প্রান্তে অবস্থিত ছিল এ জনপদ, তখন এর পরিচয় ছিলো নগরের প্রান্ত বা নগরের কান্দা। কালের বিবর্তনে মানুষের মুখে ’নগরকান্দা’ শব্দটি অধিক শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে।ভৌগলিক দিক থেকে উপজেলার অবস্থান ফরিদপুর জেলার দক্ষিণ অংশে। নগরকান্দার উত্তরে ফরিদপুর সদর ও চরভদ্রাসন, পূর্বে সদরপুর ও ভাংগা, পশ্চিমে সালথা এবং দক্ষিণে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলা। ফরিদপুর জেলা সদর থেকে নগরকান্দা থানা সদরের দূরুত্ব প্রায় ২৫ কি:মি:।

পিচ ঢালাই সড়কের দুই পাশের সবুজ বৃক্ষ, আর বৃক্ষের ছায়া ঘেরা ভিন্ন ভিন্ন নকশার একেকটি বাড়ি, বিস্তৃর্ণ ফসল, কৃষাণ-কৃষাণী বা বিবিধ ব্যবসায়ীর এ প্রাণের ভূমি, প্রায় দুইশত গ্রামের সমন্বয়ে 09টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত রয়েছে। নগরকান্দা থানা অঞ্চলটিতে বর্তমানে বসবাস করে প্রায় তিন লাখ মানুষ।

নগরকান্দা একটি নদীমাতৃক উপজেলা। এ উপজেলার বুক চিরে রয়েছে  ভুবনেম্বর ,কুমার ও শীতালক্ষ্যা নদীসহ অনেক খাল-বিল। একটা সময়ে, এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে দেশিয় মাছ পাওয়া গেলেও কালের বিবর্তনে এখন আর পাওয়া যায় না।  বর্তমানে অঞ্চলের বিল গুলোতে বিভিন্ন মাছের চাষ হচ্ছে। যা নগরকান্দা অঞ্চলের মানুষের একটি অন্যতম জীবিকা মাধ্যম বলা যায়।

এছাড়াও পোল্ট্রী খামারি ও গবাদি পশু খামারিরা রয়েছে এ অঞ্চলে। মৌসুমী ফসল ধান, পাট, গম, কালাই, সরিষা, ও আখ উতপাদনে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন এ অঞ্চলের কৃষক। তাছাড়া বিভিন্ন সবজি চাষেও এগিয়ে আছে নগরকান্দা ভুমি অঞ্চল। ফরিদপুরের কালো সোনা বলে খ্যাত পেয়াজের বীজ সবচেয়ে বেশি হয় এ অঞ্চলে। অধিক মুনাফার ফলে এলাকার  কৃষক-কষাণীরা পেয়াজের বীজ চাষে বেশ উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। আবার উপজেলার অনেকে কৃষি প্রশিক্ষণ নিয়ে ড্রাগন, স্কোয়াশ, জিরা ও বাঙ্গিসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করছে। পরিসংখ্যান মতে নগরকান্দা উপজেলাটিতে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লোকই কৃষির সাথে সম্পক্ত।নগরকান্দা উপজেলার জনগনের সাস্থ্য সুরক্ষায় রয়েছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ১টি  উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্রেক্সসহ একাধীক স্বস্থ্যসেবা কেন্দ্র।

উপজেলার শহরাঞ্চলের শিক্ষার হার বর্তমানে ৭০ শতাংশ হলেও নদী বিধৌত গ্রাম-চরাঞ্চলে লোকজনের অশিক্ষা, অজ্ঞতা, কুসংস্কারের কারণে শিক্ষার হার তুলনামূলক কম। উপজেলাটিতে রয়েছে ২ টি মহাবিদ্যালয়সহ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। উপজেলাবাসীকে আধুনকি জ্ঞান-বিজ্ঞানে পরিচালিত করার লক্ষ্যে এখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও ইনস্টিটিউট ।প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর নয়নাভিরাম দৃশ্য বহন করে আছে নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল বিল। সুবিশাল বিলটিতে  শুষ্কমৌসুমে পানি নেমে গেলে চারদিকে হেমন্তের হাওয়া বয়ে ফুটে ওঠে কাশফুলের সমারোহ। আর বর্ষায় চারদিকে ছুয়ে থাকে জলের নান্দনিক সৌন্দর্য । কখনো কখনো এই বর্ষায় বিলের দুকুল ছাপিয়ে ভেসে যায় কিছু গ্রাম।

আরো পড়ুন

শিক্ষা-শান্তি সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী এই এলাকার লোকজনের মহান আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। অমর হয়ে থাকবে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে পাকিস্থানী হানাদারদের হামলায় ৩৪ জন মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের কথাও । এই মহান যুদ্ধে তাদের আত্মত্যাগের স্মৃতি রক্ষার্থে কোদালিয়া গ্রামে নির্মিত উঠেছে  গণ কবর ও স্মৃতি স্তম্ভ। তাদের এই আত্মত্যাগ কখনো ভুলবে না উপজেলাবাসী ।অবসর সময়ে শিশু, পরিবার পরিজনদের বিনোদন ও ঘুরার জন্য নগরকান্দা উপজেলায় গড়ে উঠেছে একটি দৃষ্টি নন্দন পার্ক।এছাড়াও উপজেলায় রয়েছে বহু প্রাচীন নিদর্শন ও প্রত্নতত্ত সম্পদ। কাঠিয়ার কালিবাড়ি, তালমার কালী মন্দির, হযরত শাহ আলী বোগদাদী রহমাতুল্লাহ এর খানকা, ও সূফী মরমী সাধক মেছের শাহের মাজার।

নগরকান্দা উপজেলাটি বহুগুণীজনের বিচারণ স্মৃতিভূমি । এ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন, প্রখ্যাত ফুটবলার আব্দুল মান্না মিয়া ও খন্দকার হাবিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠতা সদস্য সাইয়াদুল ইসলাম চৌধুরী ও সাবেক সিভিল সার্জন, ফরিদপুর ডায়াবেটিকস হাসপাতালের প্রতিষ্ঠতা ডা. আবদুস ছালাম চৌধুরী।নানাগুনে বিশেষায়িত এই নগরকান্দার মানুষ মাত্র ১ দশক আগেও ভয় আর আতঙ্কে দিনাতিপাত করতে। চোর ডাকাতদের ভয়ে সারারাত লাঠি হাতে পাহাদার হয়ে দাড়িয়ে থাকতো প্রতিটি পরিবারের একজন সদস্যের।

সেই ভংয়কর সময়গুলো এখন দেখতে হয় না নতুন প্রজন্মদের। তারা এখন সাচ্ছন্দে ঘুরে বেরায় পাড়ার খেলার মাঠে, ফসলের ক্ষেতে বা লোকালয়ের রাস্তা-ঘাটে।তবে এখনো সামাজিক নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে নগরকান্দা অঞ্চলজুড়ে।মাদক, সুদে কারবার, জালিয়াতি, ইভটিজিং, যৌতুক প্রথা, জমি বিরোধ ও পারিবারিক কলহের মতো গুরুতর অপরাধগুলো এখনো কাল হয়ে রয়েছে উপজেলা জুরে।অপরাধীদের সকল অপকৌশলকে রুখতে এবার প্রশাসনও কঠোর ব্যবস্তায়ে মাঠে নেমেছেন।ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি জনাব হাবিবুর রহমান ও ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে বর্তমান আধুনিক পুলিশের এক দক্ষ ইউনিট যুক্ত হয়ে কাজ করছে জেলার প্রতিটি থানা অঞ্চলে.. ..

তারই ধারাবাহিকতায় নগরকান্দা থানাতেও মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা ও সেবায় ব্রত নিয়ে 24 ঘন্টা দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে নগরকান্দা থানার একদল সাহসী ও অভিজ্ঞ পুলিশ সদস্য।তাদের অভিভাবক হিসেবে উপজেলাকে অপরাধমুক্ত করার শপথে থানার সর্বাধিক আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন একজন সত, মেধাবী ও দক্ষ পুলিশ অফিসার জনাব মো: হাবিল হোসেন।ছোটবেলা থেকেই মানুষের সেবা করার স্বপ্নে বিভোর জনাব হাবিল নগরকান্দা থানায় যোগদান করে ইতমধ্যেই অঞ্চলের অপরাধ দমন ও থানায় নথিভুক্ত মামলার নিস্পত্তিতে ভূষয়ি প্রশংসা অর্জন করেছেন।

জনাব হাবিল তার অভিজ্ঞতার আলোকে উপজেলার মানুষের মধ্যে বিদ্যমান অপরাধগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেন ও অপরাধের পেছনের কারনও উল্লেখ করেন।নগরকান্দা থানা অঞ্চলটি প্রধানত দাঙ্গা-মারামারি প্রবণ এলাকা হওয়ায় এখানকার মানুষ একটু বেশিই বিষন্ন থাকে।

error: কপি না করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।