কামারখন্দ উপজেলা মাত্র ৯১.৬১ বর্গ কি.মি. আয়তনের ছোট্ট একটি জনপদ। সবুজ বৃক্ষের ছায়াতলে গড়ে ওঠা অনেকগুলো নীড়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একেকটি খন্ড খন্ড পাড়া। এসব পাড়ার বসতি থেকে উকি দিলেই সামনে বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠ। ধান, পাট, সরিষা ও আলুর ক্ষেতের সবুজ পাতাগুলো এখানকার কৃষকের মনে স্বস্তি আনে। কিন্তু এই স্বস্তি হারিয়ে যায় তখন, যখন ফসলগুলো বাজারজাত করণের সময় হয়। তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য এ জনপদে নেই তেমন কোন উলেখ্যোগ্য হাট-বাজার। তাই তাদের নদী পাড় হয়ে পার্শবর্তী এলাকার হাট-বাজারে যেতে হয়। যা তাদের শত বছরের ভোগান্তির কারণ।

এমনই একটি জনপদ বিশিষ্ট উপজেলার নাম কামারখন্দ। সিরাজগঞ্জ সদর থেকে এ উপজেলার দূরত্ব মাত্র ১৫ কি.মি.। এর আয়তন মাত্র ৯১.৬১ বর্গ কি.মি.। কামারখন্দ উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষ। এ জনপদটি প্রশাসনিক নগর হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলো ১৯০৯ সালে কামারখন্দ থানা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। পরে ১৯৮৪ সালে খামারখন্দ থানা অঞ্চলটি উপজেলা মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু খামারখন্দের মানুষের জীবনযাত্রার মান এখনো শত ভোগান্তির মাঝেই আটকে আছে। আজকের সবুজ সংকেত এর পর্বে থাকবে কামারখন্দ এলাকার জনজীবনের সকল খুটি-নাটি বিষয় নিয়ে নির্মিত স্বচিত্র প্রতিবেদন।

যাদের কপাল মন্দ, তাদের বাড়ি কামারখন্দ! আদি কালের সেই প্রবাদ আজও পরিবর্তন হয়নি। কামারখন্দ উপজেলা ভদ্রঘাট ইউনিয়নের ফুলজোড় নদীর অববাহিকায় অবস্থিত দশসিকা, নুরনগর গাড়াবাড়ী, নুর নগর তালপট্টি, ডিডি শাহবাজপুরের গ্রামের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ মূলত কৃষির উপর নির্ভর করেই তাদের জীবনমান উন্নয়ন ও পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু এই অঞ্চলে কোন হাট-বাজার না থাকায় কৃষকদের নদী পাড় হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের হাট বাজারে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে হয়। সেক্ষেত্রে নদীর উপর কোন সেতু আজও নির্মান না হওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষদের খেয়া পারাপারের মাধ্যমেই হাট বাজারের সকল কাজ, কোট কাচারি, স্কুল কলেজ যাতাযাত, চিকিৎসা কার্য্য পরিচালনা করতে হয়। তা ছাড়াও স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় নিত্য দিনই বিপাকে। বর্ষা মৌসুমে নৌকা ঘাটগুলোতে পর্যাপ্ত নৌকা না থাকায় নদীর পাড়েই কেটে যায় প্রতিদিনের মূল্যবান সময়। এতে করে এখানকার লোকজনের উৎপাদিত পন্য বাজারজাতকরণে জীবন জীবিকায় বিঘ্নতা সৃষ্টি হচ্চে প্রতি মুহুর্তে। তাছাড়াও নদী পাড়াপারে তাদের গুনতে হয় নগদ টাকা। সম্পতি আশার আলো ফুটেছে এখানকার মানুষের মধ্যে। ফুলজোর নদীর উপর ব্রীজের জায়গা নির্ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র প্রস্তুত হয়েছে। এখানে ব্রীজটি নির্মাণ হলে হালের অনেক সমস্যাই কেটে যাবে এসমস্ত এলাকার মানুষদের।

তাছাড়া গত ৫মার্চ ২০২৩ এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার রাস্তা-ঘাট ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। যা দ্বারা কপালমন্দ জনপদের ভাগ্যের চাকা বদলানোর বৃহত্তম আশার সঞ্চার হয়েছে।

কামারখন্দ উপজেলা মাত্র চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। ইউনিয়নগুলো হলো ভদ্রঘাট, ঝাঐল, জামতৈল এবং রায়দৌলতপুর ইউনিয়ন।  ভদ্রঘাট ইউনিয়নটি ১৬টি মৌজা ও ৩৩টি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত ২২.৯৭ বর্গ কি.মি. আয়তন বিশিষ্ট একটি ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের লোকসংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। তারা সাধারণত কৃষি পেশার উপর নির্ভরশীল। এই ইউনিয়নটি বাংলাদেশের অনন্য ব্যাক্তিত্ব মওলানা ভাসানী, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী এবং গণিত সম্রাট যাদব চক্রবর্তীর জন্মস্থান। উপজেলা সদর হতে এ ইউনিয়নটির যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে সিএনজি, অটোরিক্সাই প্রধান যানবাহন।  ইউনিয়নটিতে ছোট-বড় মোট ৮টি হাটবাজার রয়েছে।

 

কামারখন্দ উপজেলার ২নং ইউনিয়নটির নাম ঝাঐল। এর আয়তন ২১.১৩ বর্গ কি.মি। ২১টি গ্রামের সমষ্টিত ১৯টি মৌজার এই এলাকাটির জন সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। অর্থাৎ ভদ্রঘাট ইউনিয়নের আয়তনের তুলনায় ঝাঐল ইউনিয়নের জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যাধিক। এ ইউনিয়নটির বেশ কয়েকটি গ্রামে হস্তচালিত তাত শিল্প রয়েছে। তবে ইউনিয়নটির বিশেষত্ব হলো ঝাঐল শীতল পাটি প্রস্তুতের জন্য দেশ জুরে পরিচিত। উপজেলা সদর হতে এ ইউনিয়নটির প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম সিএনজি এবং অটোরিক্সা। এ ইউনিয়নের উপর দিয়ে চলমান রয়েছে ঢাকা-বগুরা মহাসড়ক। মোট হাট বাজারের সংখ্যা ৪টি।

উপজেলার ৩নং ইউনিয়নটি হলো জামতৈল। এর আয়তন ২৫ বর্গ কি.মি। লোক সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এ ইউনিয়নটি ২৫টি গ্রামের সমন্বয়ে ১২টি মৌজায় বিভক্ত একটি কৃষি ভিত্তিক অঞ্চল। খাদ্যশষ্য এবং মাছ চাষ এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস। এর ইউনিয়নের উপর দিয়ে বয়ে গেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে লাইন। এখানে জামতৈল রেল স্টেশন নামে একটি স্টেশনও রয়েছে। হাট-বাজারের সংখ্যা মাত্র ২টি। এটিই উপজেলার সদর ইউনিয়ন।

সর্বশেষ তথা উপজেলার ৪নং ইউনিয়নের নাম রায়দৌলতপুর। এর আয়তন ২২.৫৩ বর্গ কি.মি.। মোট ১৫টি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত রায়দৌলতপুর ইউনিয়নের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। ইউনিয়নটি তাত শিল্লের জন্য বিখ্যাত। এখানকার তাঁত শিল্পের উদপাতিত গামছা, লুংগি দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করা হয়ে থাকে।

 

কামারখন্দ উপজেলা ফুলজোর ও হুরা সাগর নদী বিশিষ্ট একটি জনপদ। এ জনপদটির উত্তরে রায়গঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণে বেলকুচি উপজেলা, পূর্ব পাশে সিরাজগঞ্জ সদর এবং পশ্চিমে উল্লাপাড়া উপজেলা। উপজেলার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, বর্তমান জামতৈল ইউনিয়ন পরিষদের পশ্চিম এলাকায় একদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে এসে বসতি গড়ে তোলে। পরবর্তী সময় বসতি বাড়তে থাকলে তাদের মধ্যে কামার পেশার লোকজনের হার বেশি দেখা যায়। তাই এলাকাটি কামার পাড়া নামে প্রথমে পরিচিতি পায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কামাররা তাদের প্রয়োজনে বাড়ীর দক্ষিণে মাটি কেটে একটি খাল বা খন্দক তৈরি করে। এই খালের পাশ দিয়েই ছিলো পায়ে হেটে চলার একটি সরু রাস্তা। ব্রিটিশ সরকারের একজন রেল কর্মকর্তা এই রাস্তা ধরে যাবার কালে সেই খাল বা খন্দকে পড়ে তার পা ভেঙ্গে যায়। সেই থেকে মানুষের মুখে স্থানটির নাম কামার পাড়ার খন্দক নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে কামারপাড়ার খন্দক থেকে কামারখন্দ নামের উৎপত্তি হয়। যদিও জনমুখে এলাকার নামকরণ সম্পর্কে অন্য আরেকটি গল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়।

জনশ্রুতির শ্রোতে ভেসে চলা সেই খাল বা খন্দকের মতই এখনো উপজেলাটির পথ-ঘাট দৃশ্যমান।

তবে হালে এ অঞ্চলের ব্যপক উন্নয়ন যজ্ঞ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে দশসিকা থেকে চরদশসিকা এবং বেলাই থেকে চর নুরনগর পর্যন্ত ফুলজোড় নদীতে দুইটি ব্রীজ নির্মাণ করা হলে স্থানীয়দের দুর্ভোগের পরিসমাপ্তি ঘটবে।

সেই সাথে ‘যাদের কপাল মন্দ তাদের বাড়ি কামারখন্দ’ প্রবাদকে চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য কামারখন্দ উপজেলার উপর দিয়ে চলমান রয়েছে দেশের অন্যতম ব্যস্ততাপূর্ণ মহাসড়ক ঢাকা বগুরা মহাসড়ক। এ উপজেলা সীমানাধীন মহাসড়কের দৈর্ঘ প্রায় দশ কি.মি.।

৫৫টি মৌজা ও ১০৩টি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত কামারখন্দ উপজেলার শিক্ষার হার প্রায় ৯০ শতাংশ। এ জনপদের ৯৩.৪৪ শতাংশ মানুষই মুসলীম সম্প্রদায়। তাদের জন্য উপজেলা জুড়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশত মসজিদ। আর হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রার্থনার জন্য মন্দির রয়েছে মোট ২৭টি।

অন্যদিকে উপজেলার মানুষের জন্য সরকারি যেসকল সেবা দপ্তর অবশ্যক তার সবকিছুই বিদ্যমান আছে উপজেলার প্রাণকেন্দ্র। হাসপাতাল, পোষ্ট অফিস, ভুমি অফিস, কৃষি অফিস ইত্যাদি সহ ব্যাংক, বীমা, স্কুল, কলেজ মাদ্রাসার উপস্থিতি লক্ষনীয়।

এটি একটি প্রান্তিক নগরভিত্তিক প্রশাসনিক অঞ্চল। তবে অঞ্চলটি বহু সফল মানুষের জন্মভুমি। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বর্তমান নির্বাচন কমিশনার জনাবা রাশিদা সুলতানা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা কবির বিন আনোয়ার ও সাবেক সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান।

কামারখন্দ এককালের অবহেলিত অঞ্চল হলেও বর্তমানে এলাকাটি নানা উৎপাদন শিল্পের একটি কর্মময় নগরী। এ নগর জুড়ে রয়েছে প্রায় দশ হাজার মৎস পুকুর। রয়েছে, হাস-মুরগীর খামারসহ শতাধিক গবাদিপশুর খামার। পাশাপাশি ৫০টি কুটির শিল্প ও ২টি বৃহৎ শিল্প।

 

error: কপি না করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।