ময়মনসিংহ সদর উপজেলা, বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রধান শহর। বাংলাদেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সর্বশেষ গঠিত বিভাগটির নাম এ শহরের নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার ময়মনসিংহ বিভাগের মোট ৪টি জেলার মধ্যেও ময়মনসিংহ জেলা অন্যতম। এ জেলাটি ১৩টি উপজেলায় বিভক্ত একটি ঐতিহাসিক ভূ-খন্ড। যার মধ্যে একটি উপজেলার নাম ময়মনসিংহ সদর। ঐতিহাসিক যুগে যখন এ বাংলা মাত্র কয়েকটি অংশে বিভক্ত ছিলো তখন থেকেই ময়মনসিংহের নাম স্পষ্টতা ধারন করে। তবে ময়মনসিংহের পূর্ব নাম ছিলো মোমেনশাহী। প্রাচীন কালের বিভিন্ন দলিলপত্র ও মানচিত্রে এটাই প্রামাণিত হয়েছে। জানা যায়, মমিন শাহ নামে একজন ধর্মীয় শাসকের নামানুসারে এটিকে প্রথমে মোমেনশাহী এবং পরবর্তীতে ময়মনসিংহ নামকরণ হয়। কালের বিবর্তনে প্রথমে গ্রাম, তারপর পরগোনা ও জেলা, অতপর একটি বিভাগীয় মানচিত্রে ময়মনসিংহ নামটি লিপিবদ্ধ হয়েছে।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার অবস্থান ব্রহ্মপূত্র নদী বিধৌত জেলার মধ্যভাগে। উপজেলার উত্তরে ফুলপুর উপজেলা, দক্ষিণে ত্রিশাল উপজেলা, পূর্বে গৌরীপুর ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা, পশ্চিমে মুক্তাগাছা ও ফুলবাড়িয়া উপজেলা অবস্থিত। হাজারো অট্টালিকার ভীতে গড়া ময়মনসিংহ সদর নানান পেশাজীবি মানুষের সংমিশ্রণের একটি ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ।

 

 

রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১২০ কি.মি. উত্তরে ভ্রহ্মপুত্র নদী বিধৌত একটি প্রাচীন শহর ময়মনসিংহ সদর। ঐতিহাসিক যুগে এ উপজেলার খাগডাহর এলাকার বিভিন্ন জায়গায় কাচারী বসত। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙ্গনে খাগডাহর কাচারী বিলিন হয়ে যায়। এরপর কাচারী স্থানান্তরের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৭৯১ সালের সেপ্টেম্বরে নাছিরাবাদ নামে সেহড়া গ্রামে জেলা শহরের পত্তন হয়। শহর স্থাপনের আট দশক পর ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরাবাদ পৌরসভা গঠিত হয়। এটি ছিলো বঙ্গদেশে প্রথম এবং উপমহাদেশের দ্বিতীয় পৌরসভা। যার আয়তন ছিল ২.১৫ বর্গ কিলোমিটার। পরবর্তীতে ১৯০৫ সালে নাসিরাবাদ নাম পরিবর্তন করে ময়মনসিংহ নামকরণ করা করা হয়। যা বর্তমানে দেশের দ্বাদশ সিটি কর্পোরেশন হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার প্রশাসনিক ইতিহাস আরও পুরোনো। জানা যায়, ১৭৮৭ সালে ১ মে ময়মনসিংহ তথা কোতয়ালী থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন হলে ১৯৮৪ সালে উক্ত থানাকে উপজেলায় রুপান্তর করা হয়। যা ময়মসসিংহ সদর উপজেলা নামে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার মোট আয়তন ৩৮৮.৪৫ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমানে উপজেলাটি ৩৩ ওয়ার্ড বিশিষ্ট ১টি সিটি কর্পোরেশন ও ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। সম্পূর্ণ উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় কোতোয়ালী মডেল থানার আওতাধীন। ময়মনসিংহ সদর উপজেলা ব্যবসা-বাণিজ্যে অগ্রসর হলেও উপজেলাটি ধান উৎপাদনের জন্য খুবই বিখ্যাত। ধানের পাশাপাশি পাটসহ মৌসুমী অনেক সবজি ও ফল উৎপাদন হয় এ অঞ্চলে।

তবে এটি প্রধানত ব্যবসা বান্ধব অঞ্চল। বর্তমানে এখানে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এ শহরে রয়েছে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠত বিসিক শিল্পনগরী যা ২১.০০ একর জায়গার উপর শহরের মাসকান্দা এলাকায় অবস্থিত। রয়েছে জুট মিল, ফুট ওয়ার ইত্যাদিসহ প্রায় ৯০টি মাঝারী ও ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা। এছাড়াও ময়মনসিংহ সদরে সদরে রয়েছে ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুরাল পাওয়ার কোম্পানি (আরপিসিএল) বিদ্যুত কেন্দ্র।

যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকেও ময়মনসিংহ সদর উপজেলার সুনাম সু-প্রাচীন। ময়মনসিংহ শহরে সরকারী ডাক ব্যবস্থার প্রচলন হয় ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে এ শহরে টেলিগ্রাফ অফিস স্থাপন করা হয়। এর মাত্র ৩ বছর পর ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার সাথে রেলপথ চালু হয়। বর্তমানে এ শহরের উপর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০টি মেইল ও আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে।

সড়ক যোগাযোগেও বিগত কয়েক দশকে প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ ৪ লেনের মহাসড়কটি এ উপজেলারই চরপাড়া মোড়ে এসে শেষ হয়েছে। তাছাড়া ময়মনসিংহ গোলচত্তর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-রাজশাহী-খুলনা-বগুড়া, রংপুর-পঞ্চগড়-যশোর, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোণা ও কিশোরঞ্জের সাথে সরাসরি বাস যোগাযোগ চালু রয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন ও মানুষের ভীড়ে সদর এলাকার সড়ক-মহাসড়কগুলো পূর্ণ থাকে।

 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৈচিত্রের লীলাভূমি ময়মনসিংহ সদর। এ জনপদের আছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য। সমাজ সংস্কার-শিল্প-সাহিত্য-সাংবাদিকতা-শিক্ষা-রাজনীতি-চিকিৎসাসহ নানা অঙ্গনে কালপরিক্রমায় যুগে যুগে মানুষের অংশগ্রহণ যেমন অনিবার্য ছিলো একইভাবে অংশগ্রহণকারী বিপুল জনগোষ্ঠী থেকে কেউ কেউ হয়ে উঠেছেন অনন্য ব্যক্তিত্ব।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলা ময়মনসিংহ ৪ নির্বাচনী এলাকার অন্তভূক্ত একটি জনপদ। এ জনপদটি মোট ২৪৫টি গ্রাম ও ১৩২টি মৌজা নিয়ে গঠিত। উপজেলা জুড়ে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। যেগুলো যেমনিভাবে ঐহিহাসিক তেমনি গৌরেবময়। তার অন্যতম শশীলজ যা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মহারাজা শশীকান্ত আচার্যের বাড়ী, এটি ময়মনসিংহের রাজবাড়ী নামেও সমধিক খ্যাত।

শহরের উত্তর প্রান্তে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে রয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা। এখানে বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মসমূহ সংরক্ষিত আছে।

ময়মনসিংহ শহরের ১৭ অমৃত বাবু রোডের জমিদার মদন বাবুর বাগান বাড়িতে অবস্থিত রয়েছে ময়মনসিংহ জাদুঘর। মহাভারতের প্রাচীন পান্ডুলিপি, কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি, জয়দেবের গীতগোবিন্দের পান্ডুলিপি, চন্ডীদাসের কাব্যের পান্ডুলিপি, বিশ্বে প্রকাশিত প্রথম ডাকটিকেটের ফটোকপি, ১৬৪৫ সালের পৃথিবীর মানচিত্র, ১৭৭৯ সালের কেদারনাথ মজুমদার প্রণীত বৃহত্তর ময়মনসিংহের মানচিত্রসহ জাদুঘরটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা হিসেবে কাজ করছে।

ছায়া-শীতল পথ, বন, জলরাশি আর পাখির কলতানে মুখর সদর উপজেলার নদী ও অসংখ্য জলধারা সোভিত গ্রামগুলো। এসব গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সীমাহীন কৃষিভূমি সত্তি মুগ্ধ করে। আরও ভালো লাগে উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীর স্রোত। পুরাতন ভ্রহ্মপূত্র ময়মনসিংহ সদরের প্রধান নদী। আরও রয়েছে পাগারিয়া, সুতিয়া, নাগেশ্বরী, সিরখালি, চোরখাই, বাড়েরা ও হিংরাজানি নদী। এসব নদী ও অসংখ্য হাওর-বাওর উপজেলার মাটি ও প্রাণে প্রভাব রাখছে। ভ্রহ্মপূত্র নদীর উত্তর পাশের পাচটি ইউনিয়ন চরাঞ্চল অদ্যুসিত। এসব চরাঞ্চলের মানুষের জীবন জাপনে বৈচিত্র লক্ষনীয়।

error: কপি না করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।